নিরপেক্ষতায় এগিয়ে আমরা...

বুধবার, জুলাই ২৮, ২০২১

‘টাকা নাই, আইসিইউতে নিতে না করছি!

‘মা মইরা গেছে! আর ফিরা আইবো না। ১৫ দিন ধইরা জ্বর আছিলো। এই মাসের চাইর তারিখে হাসপাতালে নিয়া আহি। পরে পরীক্ষা কইরা ওনারা (চিকিৎসক) কইলো করোনা হইছে। দুই দিন আগে ডাক্তার আইসিইউয়ের কথা কইছিলো। আমি না কইরা দিছি। কইছি, আমাগো আর্থিক অবস্থা ভালা নাই। টাকা নাই বইলা আইসিইউতে নিতে না করছিলাম। মা যে মইরা যাইবো, জানলে রক্ত বেইছা কাচের ঘরে ঢুকাইতাম।’

গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের সামনে এ কথা বলছিলেন সুমি বেগম (৩৫)। তিনি জানান, তাঁদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে। মা মনোয়ারা বেগমকে (৬৫) জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আনেন। পরে করোনা ধরা পড়লে ঠাঁই হয় নতুন ভবনের নবম তলায় করোনা ইউনিটে। চিকিৎসা চললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগীর অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। গতকাল সকালে তিনি মারা যান। এর আগে চিকিৎসক আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে তাঁরা না করেন বলে জানান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে কোনো খরচ নেই—এ বিষয়টি জানালে সুমি বলেন, ‘আমরা কইতাম পারতাম না। ভাবছিলাম অনেক খরচ হইবো। আমাগো অর্থের অবস্থা ভালা না।’

এ সম্পর্কে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা রোগীর জন্য আইসিইউতে কোনো খরচ নেই। তবে যদি বিশেষ কোনো ওষুধ লাগে সেটার টাকা দিতে হয়। বিষয়টি হয়তো অনেকে জানে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আইসিইউ বেড খালি পাওয়াও কঠিন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ৭৮০টা করোনা বেড। এগুলো খালি হলে সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ২০টি আইসিইউ বেড থেকে প্রতিদিন যে দু-তিনটা খালি হয়, ভর্তি রোগীরা সেখানে চলে যায়। আর বাইরের রোগী যদি এখানে (আইসিইউ) আসতে চায়, তাদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। খুব দ্রুত আমরা আরো ১৩টি আইসিইউ বেড চালু করব।’

গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির পাশাপাশি অনেকে সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আবার করোনাযুদ্ধে হেরে যাওয়া স্বজনের লাশ নিয়ে আহাজারি আর কান্নায়ও ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। হাসপাতাল সূত্র জানায়, দুপুর পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত পাঁচজন রোগীর মৃত্যু হয়। নতুন ভর্তি হয়েছে অন্তত ১৬ জন। সুস্থ হয়ে ফিরেছে ছয়জন।

খুলনার হোমনা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর মেয়ে খাদিজা আক্তার জানান, চলতি মাসের ৩ তারিখে মা হিরুন নেছাকে (৫০) অতিরিক্ত শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করান। কয়েক দিনের চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ায় বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা। খাদিজা বলেন, ‘হাসপাতালের ভিতরে ভয় আর আতঙ্ক। আশপাশের কেউ মারা গেলে মা অনেক ভয় পাইতো। তখন মাকে কিছু খাওয়াইতেও পারতাম না।’ হিরুন নেছা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হইতো। মনে হইতো, এই বুঝি দম গেলো। আল্লাহ বাঁচাইছে।’

দুপুর ১২টার দিকে ময়মনসিংহ থেকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে প্রবেশ করেন নওরেশ সাহা (৫৫)। এক ঘণ্টা পর তিনি এবং তাঁর ছেলে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাচ্ছেন বলে জানান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে কেন, জানতে চাইলে নওরেশ সাহা সেখানে নিজের পরিচিত একজন থাকার কথা বলেন।

হাসপাতালের সামনে কয়েকজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ করতে দেখা যায়। স্বেচ্ছায় শ্রম দেওয়া বৃহন্নলা নামের একটি সংগঠনের এক সদস্যকে করোনা রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতেও দেখা যায়। মৃতদের লাশ অ্যাম্বুল্যান্সে উঠিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। আল-আমীন নামের ওই সদস্য বলেন, সকাল ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত চারটা লাশ অ্যাম্বুল্যান্সে উঠানো হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ১৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছে, যাদের বেশির ভাগই খুলনা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ থেকে আসা।

tags

মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন

সব খবর