নিরপেক্ষতায় এগিয়ে আমরা...

বুধবার, জুলাই ২৮, ২০২১

‘এইলা ত্রাণে কয় দিন পেট ভরি খাবা পারিম বায়’

২০ বছর ধরে চোখে দেখতে পান না বিরামপুরের আব্দুর রহমান। তখন থেকেই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। ছোট ছেলের রোজগার দিয়ে স্ত্রীসহ দুই ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। যখন কাজকাম থাকে তখন কোনোমতে সংসার চলে। কাজকাম না থাকলে খুব কষ্টে দিন যায়। এখন করোনার মধ্যে খুব কষ্টে যাচ্ছে দিন। বসুন্ধরা গ্রুপ আজকে আমাদের ত্রাণ দিল, তাদের জন্য দোয়া করি। তাদের আরো উন্নতি হোক, তারা আরো উদার হোক।’

গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় দিনাজপুরের বিরামপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে, সকাল ১১টায় নবাবগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের মাঠে, দুপুর ১২টায় হাকিমপুর বাংলা হিলি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এবং দুপুর ২টায় ঘোড়াঘাট কে সি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় এক হাজার ২০০ হতদরিদ্র ও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা।

ত্রাণ নিতে আসা জাকিরুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছেন। স্ত্রীসহ মা ও দুই মেয়ে নিয়ে কষ্টে আছেন তিনিও। বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘ভাই-বোন ছাড়া কেউ হামার সাহায্য করছু না। আজ তুমার এলা খাবার পানু। তুমার জন্য দোয়া করছু।’

ত্রাণ সহায়তা পেয়ে নবাবগঞ্জের হাশেম আলী বলেন, ‘হামার বয়স হইছে কাম করবা পারু না। একটা ছুয়া আছে, হোটোলত কাম করে। হামারে পয়সা দেয় না। হামি সাহায্য চাইয়ে খাই। এলা ত্রাণ হামাক আগে কেউ দেয় নাই, তোমরা দিলা। তোমরা ভালো থাকেন।’

বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ জীবন চলছে গৌরবালার। স্বামী, ছেলে-মেয়ে নেই। নেই নিজের কোনো ভিটা। ভিক্ষাবৃত্তি করেই জীবনের শেষ সময়টা পার করছেন। ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘মোর বাড়িঘর কিছু নাই। মানুষের দ্বারে দ্বারে বেড়াও খাই বাবা। তোমরা হামাক চাল-ডাল দিলা। ওটায় হামি অনেক দিন খামু বাবা। কারো ধারে যামু না।’

হাকিমপুরের দুই বোন বেবি খাতুন ও মরিয়ম আক্তার। শারীরিকভাবে খাটো আকৃতির হলেও স্বপ্ন দেখেন বড় হওয়ার। প্রতিবন্ধী বাবাও মারা গেছেন এক দশক আগে। মায়ের সঙ্গী হয়ে স্বপ্ন ছুঁতে জীবনসংগ্রামে লড়াই করছেন তাঁরা। কাঠখড়ির দোকান করেই চলে তাঁদের সংসার। হাকিমপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজে বড় বোন মরিয়ম পড়ছেন দ্বাদশ শ্রেণিতে আর বেবি পড়ছেন একাদশে। উপবৃত্তির মাধ্যমেই তাঁদের এই পড়াশোনার খরচ চলে। সব মিলিয়ে টানাপড়েনের জীবন তাঁদের। হাকিমপুর উপজেলার বাংলাহিলি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তাঁদের হাতে ত্রাণ তুলে দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ পেয়ে খুশি মনে মুখ ফুটে তাঁরা বলেন, ‘আমাদের পাশে থাকিয়েন আপনারা। আমরা বড় হতে চাই। আপনাদের এই খাবার দিয়ে আমরা অনেক দিন খেতে পারব। আমাদের খুব উপকার হইল।’

ত্রাণ সহায়তা পেয়ে সাইফুল ইসলাম নামের এক বৃদ্ধ বলেন, ‘টানাটানির সংসার চলিছে, কোনো কামকাইজ নাই। তোমার ত্রাণ পায় খুব উপকার হইল। বসুন্ধরার তানে হামি কৃতজ্ঞ হইলাম।’

ঘোড়াঘাটে ত্রাণ নিতে আসা কাসিদা খাতুন নামের এক বৃদ্ধা বলেন, ‘হামার ছইলপইল কেউ নাই বাবা। কামাই-রোজগার নাই। তোমার ত্রাণ পায়য়া হামরা খুব খুশি। আল্লাহ তোমাল্লার ভালো করুক। এলা ত্রাণ দিয়া হামার ঢেইল্লা দিন চলি যাইবে।’

বদিরুল আরিফিন নামের আরেক উপকারভোগী বলেন, ‘হামার এই দিকে কেউ এসব ত্রাণ দেয় না। হামার খোঁজখবর কেউ নেয় না। এইলা ত্রাণ পায়া হামার খুব উপকার হইল। কদিন পেট ভরি খাবা পারিম বায়।’

রহিম উদ্দিন বলেন, ‘হামার বয়স হয় গেইছে। কাজকামও করার বল নাই। করোনায় ছুয়াডাও কাজ পায় না। বসুন্ধরা গ্রুপ হামাক খাবারদাবার দিল, খুব উপকার হইল হামার।’

ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়ে বিরামপুর উপজেলা চেয়ারম্যান খাইরুল আলম রাজু বলেন, ‘দিনাজপুরের অসহায় এবং করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার জন্য বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই। বসুন্ধরা যেন তাদের এই মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখে, সেই প্রত্যাশা করি।’

ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, ‘করোনার কারণে গোটা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়েছে। মহামারির এই সময় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠন অতিদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরা গ্রুপ আজকে আপনাদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে। এ কারণে আমি বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করি, কালের কণ্ঠ শুভসংঘের মাধ্যমে তাদের এই মানবিক কার্যক্রম চলমান থাকবে। আমাদের অনুরোধ, আপনারা আজ যাঁরা ত্রাণ পেলেন, তাঁরা কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। করোনা মোকাবেলা করতে সহযোগিতা করবেন।’

ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন হাকিমপুর উপজেলার চেয়ারম্যান হারুন-উর রশিদ। তিনি বলেন, ‘করোনার মধ্যে এত দূর থেকে দিনাজপুর জেলায় ত্রাণ সহায়তা দেওয়ায় বসুন্ধরা গ্রুপকে এবং কালের কণ্ঠ শুভসংঘকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। দুর্যোগ মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মনোভাবকে আমরা সম্মান জানাই। করোনার মধ্যে আপনারা সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। সবাই মাস্ক পরবেন।’

ত্রাণ বিতরণে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফিউল আলম বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপের মতো শিল্পপতি ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এই করোনাকালে মানুষের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে। আমি বসুন্ধরা গ্রুপ ও কালের কণ্ঠ শুভসংঘকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।’

বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট—এই চার উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান। তিনি দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের জন্য দোয়া চেয়ে তাঁর বার্তা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান সবার কাছে পৌঁছে দেন।

বিরামপুরে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরিমল কুমার সরকার, থানার ওসি সুমন কুমার মহন্ত, বিরামপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আরমান হোসেন, বিরামপুর উপজেলার সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম তানিমসহ আবু সাঈদ মণ্ডল, মশিউর রহমান, মতিউর রহমান, নূর মোহাম্মদ, বিপ্লব হোসেন, মাহবুবুর রহমান ও মনজুর কাদের পলাশ।

নবাবগঞ্জে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ সোম, নবাবগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল কাদির, শুভসংঘের নবাবগঞ্জ উপজেলার আহ্বায়ক আকাশ কুমার পাল, সদস্যসচিব ইসমাইল হোসেনসহ সদস্য সাব্বির মাহমুদ, সাব্বির আহমেদ, হাসিবুল ইসলাম, হাসিবুর রহমান, রাব্বি আল তৌহিদ, কে ও মৃদুল, আতাহার নাইফ, সাদিক মাহমুদ, নাজমুস সাকিব ও আল মুসাব্বির আহমেদ।

হাকিমপুরে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরে আলম, পৌর মেয়র জামিল হোসেন চলন্ত, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজি, থানার ওসি ফেরদৌস ওয়াহিদ, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান শাহীন রেজা শাহিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহরাব হোসেন প্রতাব মল্লিক, হাকিমপুর উপজেলা শুভসংঘের সাধারণ সম্পাদক নাসিম বাবুসহ শুভসংঘের মোস্তাফিজুর, শোভন, নিলয়, এন্তাদুল, আরিফ, হাসান, জীবন, রাহুল, পলাশ তরিকুল, মুন্না, ফরহাদ, সাব্বির, মাসুম, আবির, আনিকা, মিতু ও শোভা। ঘোড়াঘাটে ত্রাণ বিতরণে উপস্থিত ছিলেন পৌর মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলন।

চার উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘের দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি রাসেল ইসলামসহ রশিদুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম শরিফ, ইয়াসির আরাফাত রাফি, দিনাজপুর সরকারি কলেজ শাখার হুমায়ুন পারভেজ প্রমুখ।

tags

মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন

সব খবর