নিরপেক্ষতায় এগিয়ে আমরা...

বুধবার, জুলাই ২৮, ২০২১

কম বেতনে নিয়োগ করা হয় শতাধিক শিশুশ্রমিক!

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী তৈরির কারখানায় প্রাপ্তবয়স্ক একজন শ্রমিক নিয়োগ করলে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। একই কাজের kalerkanthoজন্য একজন শিশুশ্রমিককে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা দিলেও চলে। এই সুবিধা পাওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতার কর্ণগোপে সজীব গ্রুপের ‘হাসেম ফুডস’ কারখানার মালিকপক্ষ সেখানে শতাধিক শিশুকে নিয়োগ করেছিল, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। কিশোরগঞ্জ, ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনজন ঠিকাদার এসব শিশুশ্রমিক সরবরাহ করতেন। কারখানাটিতে অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিকের মৃত্যুর পর তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে চরম অনিয়ম ও অবহেলায় কর্মীদের তালাবদ্ধ করে আটকে রেখে ‘হত্যার’ দায় এড়াতে চাইছেন কারখানাটির মালিক আবুল হাসেম। রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজের মতো করে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে চাইছেন। তবে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না করা, ভবনে ত্রুটি ও তালাবদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে সদুত্তর দিতে পারছেন না। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটিও তাঁকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। গতকাল সোমবারও নিহত শ্রমিকদের স্বজনরা হাসেম ফুডসের কারখানার সামনে ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে লাশের খোঁজ করে। গতকাল সেখান থেকে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ে গিয়ে নমুনা দিয়েছে আরো পাঁচজন স্বজন। গতকাল পর্যন্ত ৪৮ স্বজনের পরিচয় শনাক্ত করতে ৬৮ জন নমুনা দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের দিনমজুর ফজলুর রহমান ছেলে হাসনাইনের (১২) খোঁজে মর্গে ঘুরে গতকালও যান হাসেম ফুডসের সামনে। তিনি বিলাপ করে বলেন, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া একমাত্র ছেলে হাসনাইনকে কারখানাটির কাজে লাগিয়েছিলেন মোতালেব। ফজলুর রহমানের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে ছোট্ট ছেলেটিকে টার্গেট করেন মোতালেব। গত রোজার ঈদের পর নিয়ে আসেন কারখানায়। আগুন লাগার পর থেকে নিখোঁজ হাসনাইন। ফজলুর রহমান বলেন, চাকরির জন্য পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বেতন দেওয়া হতো তাঁর ছেলেকে।

অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ ১২ বছর বয়সী শান্তামণির মা শিমু আক্তার বলেন, কম বয়সে শিশুকে কাজ দিয়ে ‘খুন’ করেছেন। আগ্নিকাণ্ডের দুই দিন আগে ঠিকাদার রিপনের অধীনে অস্থায়ী ভিত্তিতে হাসেম ফুডসের ভবনটির চারতলায় কাজ নেয় শান্তামণি। ওখানে সে নসিলা উৎপাদন করত।

ঝুমা নামের আরেক তরুণী বলেন, তাঁর বোন ইসরাত জাহান তুলিও (১৬) ঠিকাদার রিপনের অধীনে কাজ করত। মোতালেব ও সিরাজের মাধ্যমে দুই মাস আগে এই কারখানায় কাজে যোগ দেয় তাঁর বোন।

মামুন (১৫) নামের কারখানার এক শ্রমিক বলে, বিভিন্ন ইউনিটে প্রায় ১০০ শিশু শ্রমিক কাজ করত। এদের বেতন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। বড়দের নিলে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দিতে হয়। তাই শিশুদের নেওয়া হতো। তারা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করত বলে জানায় মামুন।

তদন্তকারী একাধিক সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের শিশু সনদে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সার্বিক শ্রম এবং ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে হাসেম ফুডসে ছোট শিশুদেরও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা হয়েছিল। মোতালেব, সিরাজুল ইসলাম ও রিপন কিশোরগঞ্জ, ভোলাসহ কিছু এলাকা থেকে এই শিশু শ্রমিকদের এনেছেন। কারখানা যে বেতন দিত তার একটি অংশও রাখতেন এই ঠিকাদাররা। কম বেতনে শিশু শ্রমিক দিয়ে বেশি কাজ করানো যায় এবং ঠিকাদাররা সুবিধা পান—এ কারণে সিন্ডিকেট করে কারবার চলছিল। মালিকপক্ষও এতে রাজি ছিল।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে রেখে হাসেমসহ গ্রেপ্তার আটজনকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘সব দিক বিবেচনা করে আমরা রিমান্ডে নেওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’ রিমান্ডের চার দিন আগামীকাল বুধবার শেষ হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সঠিক তথ্য বের করে আনার জন্য প্রয়োজনে আমরা আবারও রিমান্ডের আবেদন করব।’

এদিকে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শ করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শামীম বেপারীর নেতৃত্বে ৯ সদস্যের ওই কমিটি দফায় দফায় বৈঠক করেছে।

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটিও আলামত সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছে। জানতে চাইলে কমিটির প্রধান, অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ বের করতে কাজ করছি।’

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের প্রধান এস এস রুমানা আক্তার বলেন, ‘চার দিনে আমরা ৪৮ জন ভিকটিমের বিপরীতে ৬৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছি। ওই ৪৮ জনের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ ও ৩১ জন নারী। এরপর পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে। নতুন করে কেউ স্বজনের খোঁজে এলে তাদেরও নমুনা আমরা নেব।’ তিনি অরো বলেন, পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় কমপক্ষে ২১ দিন সময় লাগবে।

tags

মন্তব্য

মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন

সব খবর